মহররম : তরবারির ওপর রক্তের বিজয়ের মাস


১ম পর্ব
কারবালার ঐতিহাসিক দিনগুলোকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্যে আবারো আমাদের সামনে এসেছে মুহাররাম। মুহাররাম আমাদেরকে ত্যাগের শিক্ষা দেয়। পার্থিব জগতের মোহ ভুলে কণ্টকাকীর্ণ সত্য-সঠিক পথে চলার দিক-নির্দেশনা দেয়। মুহাররাম আমাদেরকে আল্লাহ প্রদত্ত ঈমানী দায়িত্ব পালনের জন্যে ভয়-ভীতিকে তুচ্ছ জ্ঞান করে সত্যের পতাকা ওড়ানোর শিক্ষা দেয়।

হিজরি ষাট সালের কথা। খুব বেশিদিন হয়নি ইয়াযিদ তার বাবার স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। দুঃখজনকভাবে ইয়াযিদ অট্টহাসি দিয়ে বেড়াচ্ছে, মদ পান করে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তার দৃষ্টির গভীরে উদ্বেগের ছাপ লক্ষ্য করা যায়। তার মনে পড়ে যায় পিতা মুয়াবিয়ার কথা। তাকে চার জনের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেছিল। বলেছিলঃ ঐ চারজনের তিনজনকে ভয় দেখিয়ে, প্রতারণার মাধ্যমে কিংবা পদের লোভ দেখিয়ে হয়তো প্রতারিত করা যাবে অর্থাৎ তাদেরকে তাদের লক্ষ্যচ্যুত করা যাবে। কিন্তু হোসাইন ইবনে আলির সাথে তা করা যাবে না। কেননা হোসাইন রাসূলে খোদার আদর্শে বড়ো হয়েছে। তার বিশাল অন্তরাত্মার কাছে সম্মান এবং মর্যাদার গুরুত্ব বা মূল্যই দুনিয়াবি স্বার্থের তুলনায় সবচেয়ে বড়ো।

অন্য জায়গায় মদিনার গভর্নর ওয়ালিদ তার শাসনকার্য পরিচালনার কেন্দ্রে বসে বসে আরো উন্নত ও উচ্চ আসনে আসীন হবার স্বপ্ন দেখছে। হঠাৎ ইয়াযিদের একটি চিঠি পেয়ে সে সম্বিৎ ফিরে পায়ঃ
‘ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়ার পক্ষ থেকে মদিনার শাসক ওয়ালিদ ইবনে উৎবাকে জানানো যাচ্ছে যে মুয়াবিয়া মৃত্যুবরণ করেছে এবং আমাকে তার স্থলাভিষিক্ত করেছে। এখন তোমার প্রথম কাজটি হলো লোভ দেখিয়ে হোক কিংবা শক্তি প্রদর্শন করেই হোক, মদিনাবাসী বিশেষ করে হোসাইন ইবনে আলির কাছ থেকে বাইয়াত গ্রহণ করো। যে বা যারা বাইয়াত করবে না তার গলা কেটে মাথাটা আমার কাছে পাঠিয়ে দাও।’

ওয়ালিদ কিন্তু রাসূলের সন্তান হোসাইন (আ) কে ভালো করেই জানতো। তাই বিরুক্তির সাথে বললোঃ যদি মরে যেতাম এবং এই দৃশ্য যদি আমাকে দেখতে না হতো…কিন্তু তার এই দুঃখবোধ দ্রুতই উবে গেল। ইমাম হোসাইন (আ) ওয়ালিদের আমন্ত্রণে তার বাসায় গেলেন। ওয়ালিদ তাঁকে মুয়াবিয়ার মৃত্যুর কথা জানায় এবং ইয়াযিদের হাতে বাইয়াত করার বিষয়টি উত্থাপন করে। ইমাম হোসাইন (আ) তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেনঃ আমি জানি আমার পরোক্ষ বা গোপন বাইয়াতে তোমরা সন্তুষ্ট হবে না, তোমরা চাও আমি প্রকাশ্যে ইয়াযিদের হাতে বাইয়াত করি।’ ওয়ালিদ ভেবেছিল সে সফল হয়েছে। তাই তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বললোঃহ্যাঁ! ঠিক তাই। ইমাম হোসাইন (আ) বললেনঃ আগামিকাল আমার অপেক্ষায় থেকো, লোকজন নিয়ে তোমার কাছে আসবো। এমন সময় মদিনার সাবেক গভর্নর মারওয়ান ইবনে হাকাম-যে কিনা নবীবংশের প্রকাশ্য শত্রু-সে ওয়ালিদকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে বললোঃ হোসাইনকে এই ঘর থেকে বের হতে দিও না। এখানেই তার শিরোচ্ছেদ করো, নৈলে তাকে আর পাওয়া যাবে না।

হোসাইন (আ) বললেনঃ কে আমাকে ভয় দেখাচ্ছে? শোনো! ইয়াযিদের মতো একজন ফাসেক একজন নষ্ট লোকের হাতে বাইয়াত করার মতো রাসূলের বংশের কাউকে পাওয়া যাবে না। ইয়াযিদ সম্পর্কে যে কথাটি এখন বলেছি সেই কথাটাই কাল সকালে লোকজনের সমাবেশে পুনরায় বলবো।-এই বলে ভয়ঙ্কর নিরবতার মধ্য দিয়ে ইমাম হোসাইন (আ) ধীর স্থিরভাবে দৃপ্ত পদভারে ওয়ালিদের ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।
পরদিন ফজরের নামায তিনি আদায় করলেন নানা হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর মাযারের পাশে। তাঁর মনে পড়ে যায় নবীজী তাদেঁর দু’ভাইকে দেখলেই খুশি হয়ে যেতেন এবং মিম্বারে বসে বলতেনঃ ‘হাসান এবং হোসাইন হচ্ছে বেহেশতে যুবকের নেতা।’ মদিনার দিকে শেষ দৃষ্টি দিয়ে তাকালেন। হিজরি ষাট সালের রজব মাসের ২৮ তারিখ। ইমাম হোসাইন (আ) পরিবার পরিজন নিয়ে মক্কার দিকে রওনা দিলেন। ইমাম তাঁর ভাই মুহাম্মাদ ইবনে হানিফাকে একটি ওসিয়্যতনামা লেখেন।
‘বিসমিল্ল… …..রাহিম। এটি হোসাইন ইবনে আলির ওসিয়্যতনামা। আমি মদিনা থেকে চলে যাচ্ছি। আমার এই যাওয়া শান্তি সুখের সন্ধানে নয়, নয় কোনো ভয়-ভীতির কারণে। আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে নানা মুহাম্মাদ (সা) এর দ্বীনের সংস্কার করা। আমি যেখানেই থাকি না কেন, জনগণকে কল্যাণের দিকে ডাকবো এবং মন্দ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখবো….।’

সপরিবারে ইমামের মক্কায় প্রবেশের খবর শহরময় ছড়িয়ে পড়ায় তাকেঁ দেখার জন্যে আপামর লোকজন আসতে থাকে। কেননা তাঁর চেহারা ও কথা ছিল নবীজীর মতো। হোসাইন (আ) যে ইয়াযিদের বাইয়াত করেন নি তা মজলুম জনগোষ্ঠিকে ইমামের প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে। ইয়াযিদের শাসন ছিল স্বেচ্ছাচারী এবং আল্লাহর আইনের নামগন্ধও তাতে ছিল না। এদিকে,কুফা শহর থেকে ইমামের কাছে অসংখ্য চিঠি আর দূত আসতে লাগলো। কুফাবাসী সোলায়মান ইবনে সারদের ঘরে সমবেত হয় এবং সোলায়মান, হোসাইন ইবনে আলির প্রতি তাদের আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করে। সবাই একবাক্যে বলেঃ ‘ইমামের সন্তান ইমাম হোসাইন (আ) কে সবধরনের সহযোগিতা করবো।’ ইমাম প্রথম প্রথম এইসব চিঠির কোনো জবাব দিলেন না। কিন্তু চিঠির পরিমাণ কয়েক হাজার ছেড়ে গেল। এইসব চিঠিতে ইমামের কাছে লোকজন ইয়াযিদের অত্যাচারের ব্যাপারে অভিযোগ করে এবং তাঁর সাহায্য কামনা করে। ইমাম ভাবলেন জনগণকে সাহায্য করা তাঁর দায়িত্ব এবং কর্তব্য। ইমাম প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে মুসলিম ইবনে আকিলকে তাঁর দূত করে কুফায় পাঠালেন প্রকৃত অবস্থাটা জানার জন্যে। কুফায় আঠারো হাজার ব্যক্তি মুসলিমের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে। কিন্তু ইয়াযিদ খুব দ্রুত চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ওবায়দুল্ল..ইবনে যেয়াদকে কুফার গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়। ইবনে যিয়াদ ছিল খুবই মন্দ স্বভাবের লোক। তাকে কুফার গভর্নর নিযুক্ত করায় সমগ্র কুফায় ভীতিকর এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ঘটনাক্রমে জনগণ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এবং ইমামের দূত মুসলিম একাকী নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। অবশেষে শাহাদাতের পিয়ালা পান করে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান তিনি।

২য় পর্ব

কারবালার ইতিহাস সমগ্র বিশ্ব মানবতার জন্যে ব্যাপক শিক্ষণীয় ইতিহাস। অত্যাচারী শাসন শোষনের বিরুদ্ধে ইমানী শক্তিতে জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়ে যাবার ইতিহাস। সৎ কাজের প্রতি মানুষকে আহ্বান করা আর অসৎ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখার জ্বলন্ত উদাহরণ সৃষ্টির ইতিহাস। এই ইতিহাসে আরো যেসব নেতিবাচক প্রসঙ্গ ছিল তার একটি ছিল ইমামের সাথে দেওয়া জনগণের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা। যার ফলে ইমামের দূত মুসলিম একাকী নিঃসঙ্গ হয়ে শাহাদাত বরণ করেছিলেন। তারপরও ইমাম তাঁর গতিপথ পরিবর্তন করেন নি।

সকালের সূর্যটা যেন অন্য দিনের মতো নয়। অনেকটা ঝড়-তুফানের আগে প্রশান্ত স্তব্ধ আবহাওয়ার মতো। ইমাম হোসাইন (আ) হজ্ব পালন শেষে আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে যাত্রা করেন। মুসলমানদেরকে নালায়েক ও অত্যাচারী শাসকের হাত থেকে মুক্তি দেওয়াই তাঁর মহান উদ্দেশ্য। কুফায় যাবার পথে জনগণের উদ্দেশ্যে তিনি বলেনঃ ‘হে লোকজন! রাসূলে খোদা (সা) বলেছেন, যে জালেম শাসককে চিনতে পারবে-যে কিনা হারামকে হালাল মনে করে এবং রাসূলে খোদার সুন্নাতের পরিপন্থী আচরণ করে এবং মানুষের মাঝে অন্যায় এবং জুলুম করে, অথচ মুসলমানরা তাদের কাজে কর্মে কথাবার্তায় ঐ জালেম শাসকের মোকাবেলা করে না, মনে রেখো খোদা তাদেরকে উপযুক্ত স্থানেই নিয়ে যাবে অর্থাৎ তাদের জন্যে অপেক্ষা করছে দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি।’

যুহাইর বিন কিন পথিমধ্যে ইমাম হোসাইন (আ) এর সাথে যোগ দেয় এবং ইমামকে এই মর্মে প্রতিশ্রুতি দেয় যে পার্থিব এই জীবনের তুলনায় সে ইমামের সঙ্গে থাকাটাকে অগ্রাধিকার দেবে। এমন সময় দূরে লক্ষ্য করা গেল ঘোড় সওয়ার। কারা ওরা? সওয়ারিরা কাছাকাছি এলো।
ইমাম হোসাইন (আ) বললেনঃ কুফার কী খবর?
সওয়ারিদের একজন বললোঃ রাসূলে খোদার পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি সালাম। কুফার গোত্রপতিদেরকে অর্থ-কড়ি আর ঘুষ দিয়ে কিনে ফেলেছে। তাদের ব্যাগগুলোকে পূর্ণ করে দিয়ে নিজেদের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। হে হোসাইন! তারা সবাই তোমার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।

সওয়ারিদের আরেকজন বললোঃ তবে অন্যান্য লোকজন,আজ তাদের অন্তর তোমার প্রতি নিবদ্ধ কিন্তু কাল তাদের তরবারী তোমার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে।
ইমাম বললেনঃ আচ্ছা,আমার দূত কায়েস কি তোমাদের কাছে এসেছিল?
হ্যাঁ, কুফার গভর্নর ইবনে যেয়াদের লোকেরা তাঁকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে এবং তাঁকে জনগণের সামনে তোমার বিরুদ্ধে ভাষণ দিতে বলেছে। কিন্তু কায়েস তোমার এবং তোমার বাবার ব্যাপক প্রশংসা করেছেন আর ইবনে যেয়াদকে তিরস্কার করেছেন। পরে ইবনে যেয়াদের আদেশে তাকেঁ হত্যা করা হয়েছে।’
ইমামের সঙ্গীরা উদ্বিগ্ন হয়ে বললোঃ হে নবীর সন্তান! ফিরে যাও! আমাদের বিশ্বাস, এরা তোমাকে সাহায্য করবে না। মনে হলো ইমাম এ কথা শুনে বরং আরো বেশি উৎসাহিত হয়ে উঠলেন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে যাবার জন্যে। ইমাম সূরা আহযাবের ২৩ নম্বর আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন।
‘মুমিনদের মাঝে কেউ কেউ আল্লাহর সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি আন্তরিকতার সাথে রক্ষা করেছে, তাদের কেউবা মৃত্যুবরণ করেছে এবং অনেকেই অপেক্ষায় রয়েছে। তবে কেউই আল্লাহর সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে নি।’
এই বলে ইমাম ঘোড়াগুলোকে পানি খাইয়ে কারবালার দিকে রওনা দিতে বললেন।

নিস্তব্ধ মরুর মাঝে ইমামের কাফেলা এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। কেবল উটের গলার ঘন্টির ধ্বনি কানে বাজছে। হঠাৎ কাফেলার একজন আল্লা….আকবার ধ্বনি দিয়ে স্তব্ধতা ভেঙ্গে বললোঃ হে ইমাম! ওখানে তো এর আগে খেজুর বাগান ছিল না। বেশ কয়েকজন একত্রে তাকালো সেদিকে। বললোঃ ওটা খেজুর বাগান নয়। ওরা হলো অশ্বারোহী বাহিনী যাদের হাতে বর্শা-বল্লম সজ্জিত। ইমামের কাফেলা যতোই সামনে এগুচ্ছে ততোই ঐ বাহিনী আস্তে আস্তে কাছে আসতে লাগলো। তাদের সেনাপতি সামনে এসে বললোঃ তোমাদের কাছে নিশ্চয়ই পানি আছে। আমাদের বাহিনী এবং ঘোড়াগুলো তৃষ্ণার্ত। ইমাম হোসাইন (আ) জানতেন যে এরা শত্রুপক্ষের সেনা। তারপরও মহানুভবতার পরিচয় দিয়ে বললেনঃ তাদের সবাইকে এমনকি পশুগুলোকেও পানি দাও! তারপর ইমাম শত্রুপক্ষের সেনাপতিকে জিজ্ঞেস করলেনঃ কে তুমি!
সেনাপতিঃ আমি হুর ইবনে ইয়াযিদ রিয়াহি।
ইমামঃ তুমি আমাদের পক্ষের নাকি বিপক্ষের?
সেনাপতিঃ আমি তোমাদের পথ রোধ করার জন্যে এসেছি।
ইমাম তার চেহারার দিকে একবার নজর বুলিয়ে নেন। যখন তিনি বুঝতে পারলেন যে এরা কুফার অধিবাসী,তখন তাদের উদ্দেশ্যে বললেনঃ তোমরাই কি আমাকে হাজার হাজার চিঠি লেখ নি? তোমরা কি আমাকে তোমাদের শহরে আমন্ত্রণ জানাও নি?
এমন সময় ইমামের কাফেলার একজন আযান দিলেন এবং সবাইকে নামায পড়ার আহ্বান জানালেন। উভয় পক্ষের বাহিনীই ইমামের নেতৃত্বে নামায আদায় করে। তারপর ইমাম যাত্রা শুরু করার আদেশ দেন। কিন্তু হুর তার বাহিনী নিয়ে ইমামের পথ রোধ করে দাঁড়ায়।
ইমাম বলেনঃ হে হুর! আমাদের কাছে কী আশা করছো?
হুর বলেঃ তোমার পথ রোধ করা আমার দায়িত্ব।
ইমাম এবার তাদের উদ্দেশ্যে পুনরায় ভাষণ দেনঃ
“হে জনগণ! তোমাদের জন্যে দুঃখ হয়, তোমরা আমাদের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে আহ্বান করেছো। তোমাদের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে তোমাদের কাছে এলাম আর তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে তলোয়ার ওঠাচ্ছো…ধিক্কার জানাই জালেমের প্রতি, স্বেচ্ছাচারী শাসনের প্রতি। আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মুমিনগণ আমাদের কাছে কখনোই এটা প্রত্যাশা করে না যে সম্মান ও মর্যাদাময় মৃত্যুর পরিবর্তে একটা নোংরা ও জালিমের আনুগত্য বেছে নিই।” হুর নিজের বাহিনী নিয়ে ইমামের কাফেলাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করে। যদিও ইমামের প্রাঞ্জল ভাষণ তার ভেতরটাকে ওলট-পালট করে দিচ্ছে।

৩য় পর্ব

ইতিহাস আসলে আয়নার মতো। অম্ল-মধুর যা কিছুই ঘটে তা-ই ঐ আয়নায় প্রতিফলিত হয়। ইসলামের ইতিহাসের বিচিত্র ঘটনার মাঝে কারবালার ঘটনাটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। ইমাম হোসাইন (আ) এর বীরত্বপূর্ণ যে সাহসী ভূমিকা ছিল কারবালার ঘটনায় তা হক ও বাতিলের মধ্যে সংঘর্ষ হিসেবেই ইতিহাসে ভাস্বর হয়ে আছে।
হুর ইবনে ইয়াযিদ রিয়াহির ভেতরে তোলপাড় চলছিল। এদিকে ওমর ইবনে সাদ আবি ওক্কাস এসে ইমামকে আনুগত্য স্বীকারের জন্যে পীড়াপীড়ি করে। কিছুক্ষণ পর শিমার বিন জিল জুশান মুরাদি কুফার গভর্নর ওবায়দুল্ল..র চিঠি নিয়ে আসে। এভাবে রাসূলে খোদার সন্তানের শিরোচ্ছেদ করার জন্যে সশস্ত্র সেনা সমাবেশ ঘটায় ইয়াযিদ। কারবালা দুই শিবিরে ভাগ হয়ে যায়। একদিকে অস্ত্রের ঝনঝনানি আর অপরদিকে ছোট ছোট সবুজ তাঁবু। থেকে থেকে ফরমান আসছেঃ হোসাইন ইবনে আলিকে বলো সঙ্গীদের নিয়ে ইয়াযিদের আনুগত্য স্বীকার করে নিতে নৈলে গর্দান দিতে। তাদের এই গোমরাহি ইমামকে ভীষণ কষ্ট দিতো। রাত ঘনিয়ে এলে ইমাম নামায শেষে তাঁর সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে বললেনঃ ‘আমি তোমাদের মতো এতো ভালো সহচর দেখি নি আর দেখি নি আমাদের পরিবারের মতো ভালো পরিবার। আমার সাথে তোমরা যে অঙ্গীকার করেছো, তা থেকে তোমাদেরকে আমি মুক্তি দিয়ে দিচ্ছি। তোমরা এখন রাতের আঁধারকে কাজে লাগিয়ে ফিরে যেতে পারো। কারণ সমবেত সেনারা কেবল আমাকেই চায়।’
ইমামের এই বক্তব্য শুনে পর্বত প্রমাণ আস্থা ও ভালোবাসায় যারা সেদিন ইমামের সঙ্গ ত্যাগি না করে শাহাদাতের পথ বেছে নিয়েছিলেন তাঁরাই আজ ইতিহাসে জীবিত আছেন। ইমামের প্রতি আনুগত্যের সেই নিদর্শন ইতিহাসে বিরল।
আসলে ইমাম হোসাইন (আ) এর সঙ্গীরা যে জেনে শুনে বুঝেই ইমামের সাথে যোগ দিয়েছিলেন তা খুবই স্পষ্ট। ইমামকে ভালোবেসে, তাঁর প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস রেখেই তাঁরা ইমামের সাথে থেকে প্রাণপণে সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছেন। ইমাম হোসাইন (আ) এবং তাঁর সঙ্গীদের ওপর যে আঘাত হানা হয়েছে, তরবারীর সেই আঘাতের যন্ত্রণার চেয়ে আরো বেশি কষ্টকর ছিল জনগণের অজ্ঞতা এবং মূর্খতার আঘাত। সেজন্যেই জনতার চিন্তার ভূবন থেকে অজ্ঞতার পর্দা অপসারণ করাটাই ছিল তাদেঁর জন্যে গুরুত্বপূর্ণ জিহাদ। কারবালার ইতিহাসে তাই আমরা লক্ষ্য করবো ইমামের অধিকাংশ সঙ্গিই অত্যন্ত সচেতনভাবে সুন্দর করে প্রকৃত সত্যকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টায় ছিলেন। যুদ্ধের ময়দানেও প্রথমে তাঁরা সাবলিল ও প্রাঞ্জল ভাষায় ইমামের বংশ-পরিচয় তুলে ধরেছেন। কখনো কবিতার ভাষায় কখনো বা মিষ্টি ভাষণে। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন শত্রুরা ইমামের বংশের স্বরূপ নষ্ট করার উদ্দেশ্যে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছে। তাঁরা তাই সুযোগ পেলেই ইমামের পরিচয়, তাঁর লক্ষ্য ও কর্মপন্থা নিয়ে জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। কেননা ইমামের সাথীরা ছিলেন পরহেজগারীর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মানবীয় এই উচ্চতম গুণাবলি না থাকলে ইমামের সাথে কারবালায় এভাবে জেনে শুনে মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়াটা ছিল অসম্ভব ব্যাপার। এই মানবীয় সৎ গুণের কারণেই তাঁরা কিছুতেই জুলুম ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে চুপ করে বসে থাকতে পারেন নি। এটা তাদেঁর গভীর ইমানেরও পরিচয় বহন করে।

তাসূয়ার দিনে কারবালার পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে ধাবিত হতে থাকে। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও ইমামের সঙ্গীরা অবিচল আস্থা ও ইমানের সাথে নিজেদের দায়িত্ব পালন করছিলেন। চরম সঙ্কটময় পরিস্থিতিতেও তাঁরা ইমামের সাথে কৃত তাদেঁর অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন নি। এই অনড় ইমানের অধিকারী একজন ছিলেন হযরত আব্বাস (আ)। তিনি ছিলেন হযরত আলি (আ) এর ছেলে। তাঁর মা ছিলেন উম্মুল বানিন। হযরত আব্বাস ছিলেন অকুতোভয় এক যুবক। তাঁর ইমান, বীরত্ব, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক গুণাবলির কথা ছিল প্রবাদতুল্য। দেখতেও তিনি ছিলেন খুব সুন্দর। সেজন্যে তাঁকে কামারে বানি হাশিম অর্থাৎ বনী হাশেমের চাঁদ বলে ডাকতো সবাই। কারবালার অসম যুদ্ধে তিনিই ছিলেন ইমামপক্ষের প্রধান সিপাহসালার। ইমামের প্রতিরক্ষায়, নারী ও শিশুদের তাঁবুর প্রতিরক্ষায় এবং ইমাম হোসাইন (আ) এর সন্তানদের জন্যে পানির ব্যবস্থা করতে প্রাণপণে করেছেন তিনি।

ইয়াযিদের সেনারা ইমাম ও তাঁর সঙ্গীদের পরাস্ত করার লক্ষ্যে তাদের জন্যে পানি বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ইমামের কচি সন্তানেরা প্রচণ্ড তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়লে হযরত আব্বাস (আ) ফোরাতে যান পানি আনতে। নিজেও তিনি ভীষণ তৃষ্ণার্ত ছিলেন। আঁজলা ভরে পানি তুলে খেতে যাবেন এমন সময় তাঁর মনে পড়ে যায় ইমাম হোসেন (আ.) এর তৃষ্ণার্ত শিশু সন্তানের কথা। পানি ফেলে দিয়ে মশক ভর্তি করে তাঁবুর উদ্দেশ্যে রওনা দিতেই শত্রুপক্ষের তীরে তাঁর এক হাত কেটে যায়। মশকটাকে তিনি অপর হাতে নিয়ে ইমামের তাঁবুর দিকে ছুটলেন। এবার অপর হাতটিও কাটা পড়ে। মশকটাকে এবার তিনি মুখে নিয়ে তাঁবুর দিকে যেতে চাইলেন। শত্রুর তীর এবার সরাসরি তার দেহে আঘাত হানে। এভাবে শহীদ হয়ে যান তিনি।

তাসুয়ায় এরকম আরেো অনেকেই বীরত্ব আর গভীর ইমানের পরিচয় দিয়েছিলেন। নবীজীর মতো দেখতে ইমামের সন্তান আলি আকবারও যুদ্ধ করেছিলেন শত্রুদের সাথে। যুদ্ধের ময়দানে তাঁর যাবার সময় ইমাম বলেছিলেনঃ ‘হে খোদা! দেখো! চারিত্রিক সৌন্দর্য, চেহারা আর কথাবার্তায় নবীজীর মতো দেখতে যে যুবক, সেই আলি আকবার যুদ্ধে যাচ্ছে। যখনি আমি রাসূলকে দেখতে চাইতাম, আলি আকবারের দিকে তাকাতাম।’ যাই হোক আলি আকবারও প্রচণ্ড বিক্রমের সাথে লড়ে শত্রুদের অনেককে ঘায়েল করেন। কিন্তু এক পর্যায়ে শত্রুপক্ষ থেকে কাপুরুষের মতো তাঁর পিঠে তীর ছোঁড়া হয়। তিনি শহীদ হয়ে যান। কারবালায় আরো যাঁরা শহিদ হন তাদেঁর মধ্যে রাসূলের প্রিয় সাহাবা হাবিব ইবনে মাজাহের, তাঁর প্রাচীন বন্ধু মুসলিম ইবনে আওসাজা, নওমুসলিম ওহাবসহ আরো অনেকেই। এদেঁর মাঝে ব্যতিক্রমী ছিল  হুর ইবনে ইয়াযিদ রিয়াহির শাহাদাত। হুর ওমর ইবনে সাদের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলোঃ তোমরা কি সত্যি সত্যিই হোসাইনের বিরুদ্ধে লড়বে? ওমর ইবনে সাদ বললো :  হ্যাঁ! ভয়াবহ যুদ্ধ করবো। হুর কাঁপতে শুরু করলো। তাকে দেখে একজন বলে্উঠলোঃ কী হয়েছে তোমার। তোমার মতো বীরকে তো কখনো এরকম কাঁপতে দেখিনি। হুর বললোঃ দোযখ আর বেহেশতের একটিকে বেছে নিতে হবে। বেছে নেওয়ার মোক্ষম সুযোগ এখন। হঠাৎ চিৎকার করে তিনি বলে উঠলেন খোদার কসম, আমাকে টুকরা টুকরা করে ফেললেও বেহেশত ছাড়া অন্য কিছু বেছে নেবো না। এই বলে হুর ইমামের তাঁবুর দিকে যেতে যেতে বললেন, হে খোদা! তোমার নবীর সন্তানের পথ রোধ করে যে পাপ করেছি, তা তুমি ক্ষমা করে দিও। এরপর সলজ্জভাবে ইমামের সামনে এসে বললোঃ আমি আপনার পথ রোধকারী হুর। খোদার কসম জানতাম না যে আপনার সাথে এই ব্যবহার করা হবে। আমার কাজের জন্যে আমি অনুতপ্ত হয়ে এসেছি তোমার পথে নিজেকে উৎসর্গ করতে। আল্লাহ কি আমার তওবা কবুল করবেন? ইমাম বললেনঃ হ্যাঁ! আল্লাহ তওবা গ্রহণকারী। তিনি তোমার ওপর তাঁর রহমত বর্ষণ করুন। এরপর হুর বললোঃ অনুমতি দিন যুদ্ধের ময়দানে সবার আগে আমি যাবো। ইমাম অনুমতি দিলেন। হুর বীরবিক্রমে অনেকক্ষণ লড়াই করে অবশেষে শহীদ হন।

৪র্থ পর্ব

নবীবংশের গর্বিত সন্তান ইমাম হোসাইন (আ) এর শাহাদাতের পূর্বরাত একটি ঐতিহাসিক রাত। ইমাম হোসাইন (আ) এর কারবালা বিপ্লবের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আর তাঁর প্রতি অনুগতদের আস্থা এবং বিশ্বাসের দৃঢ়তা এই রাতে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। শাহাদাতের লক্ষ্যে ইমামের সঙ্গ বেছে নিয়েছেন সবাই। ইমানী দৃঢ়তা আর ইমামের প্রতি ভালোবাসার এ যেন এক অনন্য মহাকাব্য। যে মহাকাব্যের ক্যানভাস জুড়ে রয়েছে কেবলি রক্ত আর রক্তের ধারা।

প্রেমের শাহাদাতনামা আজ রাতে হয়েছে স্বাক্ষর
প্রেমিকের রক্তে কাল এই মরু হবে প্রেমের সাগর
আজ রাতে বসে আছে কাছাকাছি আলে মোস্তফা
কাল যাহরার অন্তরে জমে উঠবে তাবৎ অস্থিরতা
আজ কানে বাজে কোরানের সুরেলা তিলাওয়াৎ
কাল এই মরুতে দেখা যাবে হায়েনার উৎপাত

আজ রাতে মায়ের পাশে শয্যিত শিশু আসগর
তৃষ্ণায় শুকিয়ে আছে নিষ্পাপ ঠোঁট দুটি তার
মরুবালুকার তপ্ত বুকের মাঝে হে খোদা!‍
রচিত হবে আগামিকাল তার রক্তের শয্যা

ইমাম হোসাইন (আ) ছিলেন রাসূলে খোদার সন্তান। তাঁর মাঝে ফযিলত আর পবিত্রতার ব্যাপক সমাবেশ ঘটেছিল। তিনি কেবল একজন ব্যক্তিই নন বরং ঐতিহাসিক একজন মহান ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি কোরআনের আয়াতের অনুপ্রেরণায় প্রাণিত হয়ে এবং প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর রেখে যাওয়া জীবনাদর্শ থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্যে এমন এক সুদূর প্রসারী ইতিহাস সৃষ্টি করে গেছেন, যা যুগ যুগ ধরে বিশ্বের সকল সত্য ও ন্যায়কামী বিপ্লবের আদর্শ ও প্রেরণা হয়ে আছে। তিনি শিখিয়ে গেছেন, ভয়-ভীতি, তোষামোদি আর বেগানাপ্রীতি মানুষকে তার মনুষ্যত্ব থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। কারবালার ইতিহাস স্রষ্টাগণ এমন কজন নারী ও পুরুষ ছিলেন যাঁরা অপমান আর ভোগান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের চেয়ে শাহাদাতের মৃত্যুকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। যাতে স্বাধীনতা, মুক্তি, ঔদার্য ইত্যাদি শব্দগুলো ইতিহাসে সবসময় সতেজ ও জীবন্ত থাকে।

ইমাম হোসাইন (আ) সহ তাঁর সঙ্গীদের সবাই জানতেন কয়েক ঘণ্টা পরই তাঁরা শহীদ হবেন। তারপরও যুদ্ধের ময়দানে যাবার ক্ষেত্রে দেখা গেছে একজন আরেকজনকে অতিক্রম করে যাবার চেষ্টা করছেন। উদ্দেশ্য একটাই ঈমানী দায়িত্ব পালন করা। জীবনের শেষ রক্তবিন্দু ইসলাম নামের বৃক্ষের মূলে ঢেলে দিয়ে বৃক্ষটিকে চির সজীব রাখা। ইমামের সঙ্গীদের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। কিন্তু যাঁরা ছিলেন তাদেঁর সবাই ছিলেন ইমানী শক্তিতে পূর্ণ, বীরত্বের শক্তিতে পূর্ণ এমন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব যাঁদের উদাহরণ ইতিহাসে বিরল। হাজ্জাজ জুয়াফি নামের একজন সঙ্গী ছিলেন যিনি কারবালা পর্যন্ত পুরো পথে পথে মুযাজ্জিন হিসেবে আজান দিয়েছেন। তাঁর তাকবির ধ্বনিতে ইমামের সফরসঙ্গীগণ অনুপ্রাণিত হতেন। আশুরার দিনে এই হাজ্জাজই রক্তাক্ত শরীর নিয়ে এসেছিলেন ইমামের কাছে। ইমামকে বললেনঃ হে জনগণের পথের দিশারী! আজ আমি তোমার নানা রাসূলে খোদার সাথে সাক্ষাৎ করবো। আজ আমি আপনার বাবা ইমাম আলি (আ) এর সাক্ষাৎ পাবো। হে আমার মওলা! আমি কি আপনার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পেরেছি? ইমাম সদয় দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বললেনঃ হ্যাঁ! ঠিক তাই। আমিও আপনার পরে তাঁদেরকে দেখবো। হাজ্জাজ ময়দানে ফিরে গেল এবং নজিরবিহীন বিক্রমের সাথে লড়াই করে অবশেষে শাহাদাত বরণ করেণ।

ইতিহাস পরিক্রমায় দেখা গেছে হক এবং বাতিল সবসময় ছিল সমান্তরাল। আল্লাহর নবী-আউলিয়াগণ ছিলেন সত্য ও এক আল্লাহর অনুসারী এবং একত্ববাদের পথে আহ্বানকারী। তাঁরা মনে করতেন আল্লাহকে চেনা এবং তাঁর ইবাদাত করার মধ্যেই রয়েছে মানবীয় পূর্ণতায় পৌঁছার উপায়। আশুরা আন্দোলনে আল্লাহর ইবাদাত এবং তৌহিদের প্রাণময় প্রকাশ ঘটেছে। ইমাম হোসাইন (আ) তাঁর বক্তব্যে সত্য পথ থেকে সমাজের যে বিচ্যুতি ঘটছে সে বিষয়ে ইঙ্গিত করে বলেছেনঃ তোমরা কি দেখছো না আল্লাহর আনুগত্য পরিত্যক্ত হয়েছে। এখন সৎ কাজের আদেশ দেওয়া হচ্ছে না এবং অসৎ কাজ থেকে ফেরানো হচ্ছে না?

ইমাম হোসাইন (আ) এর অপর একটি বক্তব্যের মধ্য দিয়ে কারবালা বিপ্লবের মূল লক্ষ্যটি ফুটে উঠেছে। ইমাম যে কেবল আল্লাহর জন্যে এবং আল্লাহরই পথে লড়েছেন সেখানে যে বস্তুজগতের কোনোরকম স্বার্থ ছিল না তা স্পষ্ট হয়ে যায় ঐ ভাষণে। জনগণের উদ্দেশ্যে ইমাম বলেছিলেনঃ ‘তোমরা জানো এই ইয়াযিদ এবং তার সেনারা শয়তানের আদেশ পালন করছে। এরা বায়তুল মালকে নিজেদের স্বার্থে হস্তগত করেছে এবং আল্লাহ নির্ধারিত হারামকে করেছে হালাল আর হালালকে করেছে হারাম। তাই তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্যে আমিই সবার চেয়ে বেশি উপযুক্ত।’

এ থেকে সহজেই অনুমিত হয় যে ইমামের সামনে মাত্র দুটি পথ খোলা ছিল। এক, ইসলাম বা দ্বীনকে রক্ষা করা অথবা নিজের জীবন রক্ষা করা। কেননা কোনোরকম সংলাপ কিংবা কৌশলে দ্বীনের সংস্কার করা তখন সম্ভব ছিল না। ইমাম তাই তাঁর নশ্বর জীবনের ওপর দ্বীনকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। এজন্যেই তিনি জুলুম অত্যাচার দমনের পথে পা বাড়ালেন। রাসূলে খোদা (সা) এর একটি হাদিসের উদ্ধৃতি তুলে ধরে ইমাম বলেছিলেনঃ ‘তোমাদের মধ্য থেকে যে-ই অত্যাচারী কোনো শাসককে দেখতে পাবে যে…খোদার বিধানের বিরোধিতা করে, আল্লাহর বান্দাদের মাঝে অন্যায় এবং শত্রুতামূলক আচরণ করে, সে যদি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করে কিংবা তাকে তার আচার আচরণ কথাবার্তা থেকে না ফেরায় তাহলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাকে সেই স্থানে প্রবেশ করাবেন যেখানে প্রবেশ করবে ঐ অত্যাচারী।’

এই আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই ইমাম এবং তাঁর সাথীরা দ্বীনের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত হন। ইমামের পদাঙ্ক এমনভাবে তাঁরা অনুসরণ করেছেন যে পৃথিবীর কোনো স্বার্থই তাদেঁরকে ইমামের আনুগত্য থেকে দূরে সরাতে পারে নি। আশুরার রাতে ইমাম তাঁর সঙ্গীদের বলেছিলেনঃ ‘তোমরা যদি প্রাণে বেঁচে থাকতে চাও তাহলে যুদ্ধের ময়দানে যাওয়া থেকে আত্মরক্ষা করো। কিন্তু ইমামের একনিষ্ঠ অনুসারীগণ একবাক্যে ইমামের সাথে আমৃত্যু থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেনঃ আমরা যদি শত শত বারও মারা গিয়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাই, কিংবা আমাদের দেহগুলোকে যদি পুড়েও ফেলা হয়, তারপর আবার যদি জীবিত হই, আপনার সাথেই থাকবো। কেননা আপনি রাসূলে খোদার সন্তান, আপনি মুসলমানদের নেতা এবং পথপ্রদর্শক। মৃত্যু পর্যন্ত আমরা আপনার সাথে সর্বদা আছি।’ ইমাম হোসাইন (আ) নিজের ওপর অর্পিত ঐশী দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে জনগণকে আল্লাহর দ্বীনের সেবায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। আশুরার দিনে তাই যে-ই ইমামের কাছে যুদ্ধের ময়দানে যাবার অনুমতি চাইতেন তাকেঁই এ আয়াতটি শোনাতেনঃ ‘মুমিনদের মাঝে কেউ কেউ আল্লাহর সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি আন্তরিকতার সাথে রক্ষা করেছে, তাদের কেউবা মৃত্যুবরণ করেছে এবং অনেকেই অপেক্ষায় রয়েছে। তবে কেউই আল্লাহর সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে নি।’

৫ম পর্ব

জুলুম ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে ইমাম হোসাইন ইবনে আলি (আ) এর সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় আশুরা একটি মাইলফলকের মতো কিংবা বলা যায় এমন এক পর্বত চূড়ার মতো,সমস্ত পাদদেশ যার আঁচলে ঢাকা।এ কথার অর্থ হলো ইতিহাসের অন্য সকল ঘটনা কারবালায় সংঘটিত দশই মুহাররামের ঘটনার কাছে তুলনামূলকভাবে ঢাকা পড়ে যায়। আশুরার দিনে ইমামের শাহাদাতের মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক এই ঘটনার আপাত পরিসমাপ্তি ঘটেছিল বলে মনে হলেও মূলত সেখান থেকেই এই ইতিহাস হয়ে আছে অমর, চিরন্তন। বিশ্বব্যাপী আজ ইমাম হোসাইন (আ) এর সেই সংগ্রাম প্রতিটি স্বাধীনতাকামী আন্দোলনের নেপথ্য প্রেরণা, সকল সত্যানুসন্ধানীদের পথের দিশা।

আশুরা বিপ্লব একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এই ঘটনার বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে উন্নত নৈতিকতার ঐতিহাসিক এবং অনন্য দৃশ্য। একদিকে ইমাম হোসাইন (আ) এর সাথে আত্মত্যাগী এবং দৃঢ় ইমানের অধিকারী গুটিকয় সঙ্গী, অপরদিকে দুর্বল ইমানের অধিকারী সশস্ত্র একটি বিশাল বাহিনী। তারপরও বিশাল এই সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়বার মতো স্পৃহা তাঁদের মাঝে জেগেছিলো যে কারণে তাহলো, অপমান আর লজ্জাজনক জীবনের চেয়ে সম্মান ও মর্যাদাময় শাহাদাতকে ইমামের সঙ্গীগণ শ্রেয় মনে করেছিলেন। আশুরার দিনে হোসাইন ইবনে আলি (আ) ইয়াযিদের সশস্ত্র সেনাদের বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে এক অসমযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। কারবালাকে তিনি প্রেম ও মুক্তির দৃশ্যে পরিণত করেন।ইমাম খোমেনী (রহ)এর ভাষ্য অনুযায়ী আশুরার দিনে ইমাম হোসাইন (আ) যতোই শাহাদাতের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন ততোই তাঁর চেহারা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতরো হচ্ছিল। তাঁর যুবক সঙ্গীরাও কার আগে কে যাবেন যুদ্ধের ময়দানে সে ব্যাপারে একরকম প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন যেন। যদিও সবাই জানতেন কিছুক্ষণ পরই তাঁরা শহীদ হবেন।

রাসূলে খোদা (সা)মানুষের গোলামি করা কিংবা তাদের বন্দিত্বকে মেনে নেওয়াকে মানবীয় মর্যাদার অপমান এবং লজ্জাজনক উল্লেখ করে বলেছেনঃ ‘যারা স্বেচ্ছায় নিজেদের অপমান মেনে নেয় তারা আমাদের খান্দানের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ কেননা আল্লাহ মানুষের উন্নত মর্যাদা ও মুক্তি কামনা করেন এবং কোনোভাবেই বলদর্পী ও অহংকারীদের দাসত্ব করার মতো লাঞ্ছনাকে পছন্দ করেন না।ইমাম হোসাইন (আ) তাঁর এক ভাষণে বলেছেন; স্মরণ রেখো!ইবনে যেয়াদ আমার সামনে দুটি পথ খোলা রেখেছে। মৃত্যু অথবা অপমানজনক আনুগত্য। কিন্তু অপমান কিংবা লাঞ্ছনা রাসূলে খোদার খান্দান থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে। আর না আল্লাহ তা মেনে নেবেন, না তাঁর রাসূল।

আসলে মানব মর্যাদাকে সমুন্নত রাখতেই ইমাম হোসাইন (আ) বুদ্ধিদীপ্ত দূরদর্শিতা ও সচেতনতার সাথে আশুরা আন্দোলন করেছিলেন।কারবালার ঘটনায় ইমামের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের ব্যাপক বিজয় হয়েছিল। সেজন্যে সবাই ইমাম এবং তাঁর সঙ্গীদের প্রতি আজীবন শ্রদ্ধা ও সম্মান নিবেদন করেন। জুলুমের বিরুদ্ধে তাঁর এই ঐতিহাসিক বিদ্রোহ এবং তাঁর ন্যায়কামী আন্দোলনের কথা ইতিহাসের পাতা থেকে কোনোদিন মুছে যাবে না বরং মানব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে তাঁর ঐ আন্দোলন নেপথ্য প্রেরণা হয়ে থাকবে। কেননা যৌক্তিক,বুদ্ধিদৃপ্ত এবং মানুষের জন্যে কল্যাণকর যে কোনো বার্তাই অমরত্ব লাভ করে। মানুষের মন এবং আত্মার ওপর সেগুলো যুগ যুগ ধরে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিম দিকে। অস্তমান সূর্য এখন রক্তের রং ধারণ করেছে।ইমাম হোসাইন (আ) নবীজীর প্রিয় সন্তান, বেহেশতের যুবনেতা শত্রু পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েছেন। শেষবারের মতো তিনি তাঁর পরিবার পরিজন আর ছোট্ট নবজাতকের কাছ থেকে বিদায় নিতে চাচ্ছিলেন। এমন সময় শত্রুর তীর এসে ঐ ছোট্ট শিশুর কচি ও নরম গলা ভেদ করলো। ইমাম হোসাইন (আ)চোখের সামনে আপন সন্তানের মৃত্যুর ছটফটানির অন্তর্জ্বালা নিয়ে আঁজলা ভরে ছোট্ট ঐ শিশুর রক্ত নিয়ে আকাশের দিকে ছুড়েঁ মারলেন এবং আল্লাহ যেন এই কোরবানী কবুল করেন সেজন্যে দোয়া করলেন।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো ইমাম হোসাইন (আ) এর শাহাদাতের মুহূর্তগুলো ছিল আল্লাহর আনুগত্য ও ঐশী প্রেমে পূর্ণ। সেখানে কোনো ভয়ভীতি ছিল না। ছিল না পিছু হটার মতো কোনোরকম কাপুরুষি চিন্তা।আপন সিদ্ধান্তে অটল অবিচল থেকে ইমাম এমনভাবে যুদ্ধ করলেন যেন তাঁর পিতা শেরে খোদা ইমাম আলী (আ) যুদ্ধ করছেন। হঠাৎ যারআ বিন শারিক ইমামের বাঁহাতে প্রচণ্ড আঘাত করে এবং আরেকটি আঘাত হানে ইমামের ঘাড়ে। ইমাম তাই দুর্বল হয়ে পড়েন। আঘাতের যন্ত্রণায় ঘোড়ার পিঠ থেকে মাটিতে পড়ে যান। তারপর শত্রুদের কেউই ইমামের পবিত্র মস্তক দেহ থেকে পৃথক করতে সাহস করলো না।অবশেষে নিষ্ঠুর একজন ইমামের মাথায় তলোয়ার চালায়। ইমামের মাথা থেকে দরদর করে রক্ত বেরুতে লাগলো। ইমাম আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করলেনঃ ‘হে খোদা! তোমার সন্তুষ্টিতেই আমি সন্তুষ্ট। আমি তোমার আদেশের কাছে সর্বদা অনুগত।’

ইয়াযিদের সেনাপতি ওমর সাদ চীৎকার করে বললোঃ নামো! বাকি কাজ সমাধা করো। সেনান বিন আনাস ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে ইমামের মাথার পাশে গেল। ইমামের গলার ওপর তরবারী নিয়ে বললোঃ খোদার কসম আমি তোমার মাথা কেটে ফেলবো। যদিও আমি জানি তুমি রাসূলে খোদার সন্তান এবং পৃথিবীর বুকে তোমার বাবা-মাই শ্রেষ্ঠ।ইমাম প্রচণ্ড তৃষ্ণা জড়িত কণ্ঠে গুঞ্জন করে কোরান তেলাওয়াত করলেন। অমনি রচিত হলো আশুরার মর্মন্তুদ ও ঐতিহাসিক ঘটনা।

One thought on “মহররম : তরবারির ওপর রক্তের বিজয়ের মাস

  1. Pingback: মহররম : তরবারির ওপর রক্তের বিজয়ের মাস « বিশ্বকোষ

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s